বাসায় কাকাতো ভাই এসেছিলো কিন্তু রাতে বউ কে না পেয়ে নিজের ছোট বোনের সাথেই রাত ...See

মেয়েটি হেসে বলল, —তাহলে তো আমাদের আগে দেখা হওয়ার কথা! আরিফ মৃদু হেসে উত্তর দিল, —হয়তো দেখা হয়েছে, কিন্তু এভাবে কথা হয়নি। মেয়েটির নাম ছিল নীলা। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে তাদের কথাবার্তা খুব বেশি হয়নি। বৃষ্টি থামার পর নীলা চলে গিয়েছিল নিজের পথে। আরিফও বাড়ি ফিরেছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পরও তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল নীলার হাসিটা। সে জানত না, এই সামান্য পরিচয় একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসায় পরিণত হবে। ### ❤️ শেষ বিকেলের সেই ভালোবাসা একটি দীর্ঘ, আবেগময় প্রেমের গল্প—যেখানে ভালোবাসা আছে, অভিমান আছে, বিচ্ছেদ আছে, আর আছে অপেক্ষার শেষ প্রহর। ### প্রথম পরিচয়: এক বৃষ্টিভেজা বিকেল সেদিন আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। রাস্তার দুপাশে জমে থাকা পানিতে গাড়ির চাকা ছিটিয়ে দিচ্ছিল কাদামাখা জল। মানুষজন যে যার মতো ছুটছিল বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। আরিফ সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল। হাতে কয়েকটা বই, কাঁধে ব্যাগ। বৃষ্টির জন্য একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সে। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল পাশের এক মেয়ের দিকে। মেয়েটির পরনে ছিল নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ। লম্বা চুলগুলো বৃষ্টির পানিতে কিছুটা ভিজে গেছে। হাতে একটা বই, আর চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। আরিফ প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। কিন্তু হঠাৎ বাতাসে মেয়েটির হাত থেকে একটা কাগজ উড়ে এসে তার পায়ের কাছে পড়ল। সে কাগজটা তুলে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিল। —এই যে, আপনার কাগজটা। মেয়েটি একটু অবাক হয়ে তাকাল। —ওহ, ধন্যবাদ! —আপনি কি এখানেই পড়েন? —হ্যাঁ, বাংলা বিভাগে। আপনি? —আমিও। তৃতীয় বর্ষ। মেয়েটি হেসে বলল, —তাহলে তো আমাদের আগে দেখা হওয়ার কথা! আরিফ মৃদু হেসে উত্তর দিল, —হয়তো দেখা হয়েছে, কিন্তু এভাবে কথা হয়নি। মেয়েটির নাম ছিল নীলা। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে তাদের কথাবার্তা খুব বেশি হয়নি। বৃষ্টি থামার পর নীলা চলে গিয়েছিল নিজের পথে। আরিফও বাড়ি ফিরেছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পরও তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল নীলার হাসিটা। সে জানত না, এই সামান্য পরিচয় একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসায় পরিণত হবে। ### দ্বিতীয় অধ্যায়: বন্ধুত্বের শুরু পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে আবার দেখা হলো তাদের। নীলা দূর থেকে আরিফকে দেখে নিজেই এগিয়ে এল। —এই যে, বৃষ্টির দিনের মানুষ! কেমন আছেন? আরিফ একটু হেসে বলল, —ভালো। আপনি? —ভালো। আচ্ছা, আপনার নামটা তো সেদিন জানাই হয়নি! —আমি আরিফ। —আমি নীলা। যদিও সেটা আপনি জানেন। দুজনেই হেসে উঠল। সেদিন থেকে তাদের দেখা হলে কথা হতো। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যাম্পাসের চায়ের দোকানে, কখনো ক্লাস শেষে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গভীর হতে লাগল। নীলা ছিল খুব প্রাণবন্ত। ছোট ছোট বিষয়েও আনন্দ খুঁজে পেত। আরিফ ছিল একটু চুপচাপ। নিজের অনুভূতি সহজে প্রকাশ করতে পারত না। নীলা প্রায়ই বলত, —আপনি এত চুপচাপ থাকেন কেন? আরিফ বলত, —সব কথা কি মুখে বলতে হয়? —তাহলে কীভাবে বলতে হয়? —কিছু কথা মানুষ চোখে বলে। নীলা হেসে বলত, —বাহ! আপনি তো দেখি বেশ কবি! আরিফ শুধু হাসত। কিন্তু নীলা জানত না, আরিফের চোখে তখন থেকেই তার জন্য আলাদা একটা অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল। প্রতিদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে আরিফ ভাবত, আজ নীলার সঙ্গে দেখা হবে তো? আর নীলা? সেও অজান্তেই আরিফকে খুঁজত ভিড়ের মধ্যে। একদিন নীলা ক্লাসে আসেনি। সেদিন আরিফ বারবার ফোনের দিকে তাকিয়েছিল। অবশেষে বিকেলে একটা মেসেজ পাঠাল। আরিফ: আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেননি কেন? কিছুক্ষণ পর উত্তর এল। নীলা: শরীরটা ভালো না। একটু জ্বর। আরিফের মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। আরিফ: এখন কেমন আছেন? নীলা: আগের চেয়ে ভালো। এত চিন্তা করছেন কেন? আরিফ অনেকক্ষণ মেসেজের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল, আরিফ: কারণ আপনি আমার বন্ধু। নীলা মেসেজটা পড়ে মৃদু হাসল। কিন্তু তার মনেও তখন একটা প্রশ্ন জন্ম নিয়েছিল— শুধু বন্ধু বলেই কি এতটা খোঁজ নেয় কেউ? ### তৃতীয় অধ্যায়: ভালোবাসার প্রথম স্বীকারোক্তি শীতের এক বিকেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের পাশে একটা পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসেছিল আরিফ আর নীলা। চারপাশে হালকা বাতাস। দূরে কয়েকজন শিক্ষার্থী আড্ডা দিচ্ছিল। আকাশে তখন সূর্য ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নীলা একটা বই পড়ছিল। আরিফ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ নীলা বই বন্ধ করে বলল, —একটা কথা বলব? —বলুন। —আপনি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন? প্রশ্নটা শুনে আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, —হ্যাঁ। নীলা একটু অবাক হলো। —সত্যি? কে সে? আরিফ মৃদু হেসে বলল, —সে খুব কাছেই আছে। নীলা চারদিকে তাকাল। —কোথায়? আরিফ এবার সরাসরি নীলার চোখের দিকে তাকাল। —আমার সামনে। নীলার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। —আপনি কি সত্যি বলছেন? —হ্যাঁ, নীলা। অনেক দিন ধরেই একটা কথা বলতে চেয়েছি। কিন্তু সাহস হয়নি। নীলা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিফ ধীরে ধীরে বলল, —আমি জানি না, তোমার মনে আমার জন্য কী আছে। আমি তোমার কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি চাইতে আসিনি। শুধু আমার মনের কথাটা জানাতে চেয়েছি। তোমার সঙ্গে কথা না হলে দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে। তোমার মন খারাপ হলে আমারও ভালো লাগে না। তোমার হাসিটা দেখলে মনে হয়, পৃথিবীটা এখনো সুন্দর। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর নীলা খুব আস্তে বলল, —এত দিন লাগল বলতে? আরিফ অবাক হয়ে তাকাল। —মানে? নীলা মৃদু হেসে বলল, —আমি কি বুঝতে পারিনি? আরিফের মুখে তখন অবিশ্বাস আর আনন্দ মিশে গেছে। —তাহলে…? নীলা তার কথাটা শেষ করে দিল। —আমিও তোমাকে ভালোবাসি, আরিফ। সেদিন সূর্যটা ঠিক কখন ডুবে গিয়েছিল, তারা কেউ খেয়াল করেনি। তাদের কাছে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা থেমে গেছে। সেই বিকেলেই শুরু হয়েছিল তাদের ভালোবাসার নতুন অধ্যায়। ### চতুর্থ অধ্যায়: ছোট ছোট সুখের দিন ভালোবাসার দিনগুলো সব সময় বড় কোনো ঘটনার জন্য সুন্দর হয় না। কখনো একটা ছোট্ট মেসেজ, কখনো এক কাপ চা, কখনো পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতেই একটা বিকেল মনে থেকে যায় সারাজীবন। আরিফ আর নীলার জীবনেও এমন অনেক ছোট ছোট মুহূর্ত জমতে লাগল। নীলা পরীক্ষার আগে খুব চিন্তা করত। আরিফ তাকে পড়া বুঝিয়ে দিত। আরিফ কোনো বিষয়ে মন খারাপ করলে নীলা বলত, —সবকিছু নিয়ে এত ভাবো কেন? একটু হাসতে শেখো! আরিফ উত্তর দিত, —তুমি পাশে থাকলে হাসি এমনিতেই চলে আসে। কখনো তারা একসঙ্গে লাইব্রেরিতে বসে পড়ত। কখনো ক্যাম্পাসের বাইরে চায়ের দোকানে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত। নীলা স্বপ্ন দেখত, একদিন সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। একটা সুন্দর চাকরি করবে। নিজের বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে। আরিফও স্বপ্ন দেখত, পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পাবে। তারপর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নীলাকে বিয়ে করবে। একদিন নীলা জিজ্ঞেস করেছিল, —তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও কেন? আরিফ হেসে বলেছিল, —কারণ তোমার সঙ্গে সারাজীবন গল্প করতে চাই। —শুধু গল্প? —আর কী চাই? নীলা একটু অভিমানী গলায় বলেছিল, —তুমি কখনো রোমান্টিক হতে পারবে না! আরিফ হেসে উত্তর দিয়েছিল, —আমি রোমান্টিক হতে জানি না। তবে তোমাকে ভালোবাসতে জানি। নীলা কিছু বলেনি।

video link

Please wait a moment

শুধু মনে মনে ভেবেছিল, এই মানুষটার সঙ্গেই সে তার জীবনের বাকি গল্পগুলো লিখতে চায়। ### পঞ্চম অধ্যায়: দূরত্বের শুরু সময় কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ চলে এল। পড়াশোনার চাপ বাড়ল। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা বাড়তে লাগল। আরিফের পরিবারে আর্থিক সমস্যা দেখা দিল। বাবার ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে এসে পড়ল। আরিফ ঠিক করল, পড়াশোনার পাশাপাশি একটা চাকরি খুঁজবে। অন্যদিকে নীলার পরিবারও তার বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করল। একদিন সন্ধ্যায় নীলা ফোন করে বলল, —আরিফ, একটা কথা বলব? —বলো। —বাসায় আমার বিয়ের কথা বলছে। আরিফের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। —তুমি কী বলেছ? —আমি বলেছি, এখন বিয়ে করতে চাই না। —তারপর? —তারা বলছে, পড়াশোনা শেষ হলে আর দেরি করবে না। আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নীলা বলল, —তুমি কিছু বলছ না কেন? আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, নীলা। কিন্তু এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিনি। তোমার পরিবারের সামনে কীভাবে দাঁড়াব? নীলা শান্ত গলায় বলল, —আমি তোমার কাছে অনেক টাকা চাই না, আরিফ। আমি শুধু চাই, তুমি চেষ্টা করো। —আমি চেষ্টা করছি। —আমি জানি। কিন্তু দুজনের কেউই জানত না, সামনে তাদের জন্য কত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ### ষষ্ঠ অধ্যায়: অভিমান চাকরির জন্য আরিফকে অন্য শহরে যেতে হলো। প্রথম দিকে প্রতিদিন কথা হতো। রাতের শেষে ফোনে গল্প করতে করতে কখন যে সময় পার হয়ে যেত, তারা বুঝতেই পারত না। কিন্তু ধীরে ধীরে কাজের চাপ বাড়তে লাগল। আরিফ কখনো ক্লান্ত হয়ে ফোন ধরতে পারত না। কখনো মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হতো। নীলা অপেক্ষা করত। প্রথমে কিছু বলত না। পরে অভিমান জমতে লাগল। এক রাতে নীলা ফোনে বলল, —তুমি কি বদলে গেছ? আরিফ অবাক হয়ে বলল, —কেন এমন বলছ? —আগের মতো কথা বলো না। আমার খোঁজ নাও না। —নীলা, আমি খুব ব্যস্ত থাকি। তুমি তো জানো। —আমি জানি। কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যেও কি আমাকে একটু মনে করা যায় না? আরিফ ক্লান্ত গলায় বলল, —আমি সারাদিন কাজ করি, সংসারের চিন্তা করি। সব সময় কি তোমার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব? কথাটা শুনে নীলা চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বলল, —আমি তো তোমার কাছে সারাদিন সময় চাইনি, আরিফ। শুধু একটু অনুভব করতে চাই যে আমি এখনো তোমার জীবনে আছি। আরিফ বুঝতে পারল, কথাটা তার বলা উচিত হয়নি। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। নীলা ফোন রেখে দিল। সেদিন রাতে দুজনের কেউই ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। পরদিন আরিফ অনেকবার ফোন করেছিল। নীলা ফোন ধরেনি। তারপর একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল— “আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। কিন্তু তোমার জীবনে নিজের জায়গাটা হারিয়ে ফেলছি বলে মনে হচ্ছে।” আরিফ মেসেজটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল। সে বুঝতে পারছিল, ভালোবাসা শুধু ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করার নাম নয়। বর্তমানেও প্রিয় মানুষটাকে অনুভব করানো দরকার যে সে গুরুত্বপূর্ণ। ### সপ্তম অধ্যায়: শেষ দেখা কয়েক মাস পর আরিফ ছুটিতে বাড়ি ফিরল। নীলার সঙ্গে দেখা করার জন্য সে একটা বিকেল ঠিক করেছিল। সেই পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে ছিল তারা। যেখানে একদিন তাদের ভালোবাসার শুরু হয়েছিল। নীলা আগের মতোই ছিল, কিন্তু তার চোখে একটা চাপা বিষণ্ণতা। আরিফ বলল, —কেমন আছ? —ভালো। —আমার ওপর এখনো রাগ করে আছ? নীলা একটু হাসল। —রাগ করে থাকলে কি তুমি ফিরে আসতে? আরিফ মাথা নিচু করল। —আমি জানি, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —আরিফ, বাসায় আমার বিয়ের জন্য খুব চাপ দিচ্ছে। আরিফের বুকটা ধক করে উঠল। —তুমি কী চাও? নীলা তার দিকে তাকাল। —আমি তোমার সঙ্গে থাকতে চাই। কিন্তু শুধু অপেক্ষা করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আরিফ বলল, —আমাকে আর একটু সময় দাও। আমি সব ঠিক করে ফেলব। নীলা মৃদু গলায় বলল, —কত দিন? আরিফ উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে জানত, তার হাতে কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। নীলা চোখ নামিয়ে বলল, —আমি তোমাকে ভালোবাসি, আরিফ। কিন্তু আমারও একটা পরিবার আছে। তাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আমি চাইলেই সবকিছু উপেক্ষা করতে পারি না। আরিফের চোখ ভিজে উঠল। —তাহলে কি আমাদের সব শেষ? নীলা মাথা নাড়ল। —আমি জানি না। সেদিন তারা অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসে ছিল। কেউ কাউকে দোষ দেয়নি। কেউ ভালোবাসা অস্বীকার করেনি। কিন্তু তাদের দুজনের মাঝখানে এমন কিছু বাস্তবতা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, যেগুলো শুধু ভালোবাসা দিয়ে সরানো যাচ্ছিল না। ### অষ্টম অধ্যায়: যে মেসেজের উত্তর আসেনি কয়েক সপ্তাহ পর নীলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। খবরটা আরিফ জানতে পারল নীলার এক বান্ধবীর কাছ থেকে। সেদিন সন্ধ্যায় সে অনেকক্ষণ ফোন হাতে বসে ছিল। তারপর নীলাকে একটা মেসেজ লিখল। “নীলা, তুমি কি সত্যিই অন্য কারো সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছ?” অনেকক্ষণ পর নীলার উত্তর এল। “আরিফ, সবকিছু আমার ইচ্ছেমতো হচ্ছে না। আমি তোমাকে ভুলে যাইনি।” আরিফ লিখল, “তাহলে আমাকে একবার বলো, আমি কী করতে পারি?” নীলা উত্তর দিল, “তুমি নিজের জীবনটা গুছিয়ে নাও। নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করো। আমাকে নিয়ে নিজেকে থামিয়ে রেখো না।” আরিফের মনে হলো, নীলা তাকে নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সে লিখল, “তুমি কি আর আমাকে ভালোবাসো না?” এবার উত্তর আসতে অনেক সময় লাগল। শেষে শুধু একটা লাইন এল— “ভালোবাসি বলেই চাই, তুমি ভালো থেকো।” আরিফ আর কোনো উত্তর দিতে পারেনি। কিছুদিন পর নীলার বিয়ে হয়ে গেল। সেদিন আরিফ কোনো ফোন করেনি। কোনো মেসেজও পাঠায়নি। শুধু পুরোনো কথাগুলো মনে করেছিল। বৃষ্টিভেজা সেই বিকেল। নীলার প্রথম হাসি। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বলা ভালোবাসার কথা। আর সেই প্রতিশ্রুতি—একদিন তারা একসঙ্গে সারাজীবন গল্প করবে। ### নবম অধ্যায়: পাঁচ বছর পর সময় চলে গেল। আরিফ ধীরে ধীরে নিজের জীবন গুছিয়ে নিল। চাকরিতে উন্নতি হলো। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও আগের চেয়ে ভালো হলো। কিন্তু নীলার স্মৃতি পুরোপুরি মুছে গেল না। সে আর আগের মতো প্রতিদিন নীলার কথা ভাবত না। তবু কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে, কোনো পুরোনো গান শুনলে, কিংবা কৃষ্ণচূড়া ফুল দেখলে তার মনে পড়ে যেত সেই মানুষটার কথা। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পুরোনো বন্ধুর বিয়েতে গিয়েছিল আরিফ। অনেক বছর পর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। অনুষ্ঠানের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সে। হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শুনতে পেল। —আরিফ? সে ঘুরে তাকাল। নীলা। পাঁচ বছর পর। নীলার মুখে সেই পরিচিত হাসি। তবে চোখে সময়ের ছাপ। আরিফ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। নীলা বলল, —কেমন আছ? আরিফ মৃদু হেসে বলল, —ভালো। তুমি? —আমিও ভালো। কথাটা বলেই নীলা একটু থেমে গেল। তারপর বলল, —অনেক দিন পর দেখা হলো, তাই না? আরিফ মাথা নাড়ল। —হ্যাঁ, অনেক দিন। দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব থাকল। নীলা জিজ্ঞেস করল, —তুমি এখন কী করো? আরিফ নিজের চাকরির কথা বলল। পরিবারের কথা বলল। নীলাও তার জীবনের কিছু কথা বলল। তাদের কথাবার্তা ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু সেই সাধারণ কথার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অনেক পুরোনো স্মৃতি। একসময় নীলা বলল, —তোমার কি কখনো আমার কথা মনে পড়ে? আরিফ একটু হাসল। —কিছু মানুষকে কি এত সহজে ভোলা যায়? নীলার চোখে এক মুহূর্তের জন্য জল চিকচিক করে উঠল। সে বলল, —আমি ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো আমাকে ভুলে গেছ। আরিফ শান্ত গলায় বলল, —ভুলে যাওয়া আর সামনে এগিয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়, নীলা। নীলা কোনো উত্তর দিল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ### দশম অধ্যায়: পুরোনো চিঠি অনুষ্ঠান শেষে নীলা আরিফকে একটা ছোট খাম দিল। —এটা তোমার জন্য। আরিফ অবাক হয়ে বলল, —কী আছে এতে? —বাড়ি গিয়ে পড়ো। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে আরিফ খামটা খুলল। ভেতরে একটা চিঠি। নীলার হাতের লেখা। চিঠিতে লেখা ছিল— “প্রিয় আরিফ, জানি না, এই চিঠি তোমার কাছে পৌঁছানো উচিত কি না। তবু অনেক বছর ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা কিছু কথা লিখতে ইচ্ছে হলো। তোমার সঙ্গে কাটানো দিনগুলো আমার জীবনের খুব সুন্দর একটা অংশ। আমি জানি, আমাদের গল্পটা যেভাবে শেষ হয়েছে, সেটা আমরা কেউ চাইনি। তুমি হয়তো ভেবেছিলে, আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি। কিন্তু সত্যিটা হলো, তখন আমি নিজেও জানতাম না কীভাবে সবকিছু সামলাব। আমি তোমার ওপর রাগ করেছিলাম। তোমার ব্যস্ততা, তোমার নীরবতা, তোমার দূরত্ব—সবকিছু আমাকে কষ্ট দিত। কিন্তু কখনো ভাবিনি, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাটা মিথ্যা ছিল। আজ এত বছর পর বুঝতে পারি, ভালোবাসা থাকলেও সব সম্পর্ক একসঙ্গে থাকা পর্যন্ত পৌঁছায় না। তুমি তোমার জীবন গুছিয়ে নিয়েছ, এটা জেনে আমার ভালো লাগে। আমিও আমার জীবনে অনেক কিছু শিখেছি। তোমার কাছে আমার কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা কথা বলতে চাই— তুমি আমার জীবনের সেই মানুষ, যার সঙ্গে হয়তো আমার সারাজীবন কাটেনি, কিন্তু যার সঙ্গে কাটানো কিছু মুহূর্ত আমি কোনো দিন ভুলব না। ভালো থেকো, আরিফ। তোমার পুরোনো বন্ধু, নীলা।” চিঠিটা পড়ে আরিফ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর চিঠিটা যত্ন করে ভাঁজ করে রেখে দিল। সে বুঝতে পারল, কিছু ভালোবাসার গল্পের শেষটা একসঙ্গে থাকা নয়। কিছু গল্পের শেষটা হয় একে অপরের স্মৃতিতে ভালোভাবে বেঁচে থাকা। ### একাদশ অধ্যায়: শেষ বিকেলের দেখা কয়েক মাস পর আরিফ একটা কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ক্যাম্পাসে গেল। সেদিনও আকাশটা মেঘলা ছিল। হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে সেই পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে এসে দাঁড়াল। গাছটা আগের মতোই আছে। শুধু সময় বদলে গেছে। আরিফ গাছটার নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে পড়ল, নীলা একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল— “তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও কেন?” আর সে বলেছিল— “কারণ তোমার সঙ্গে সারাজীবন গল্প করতে চাই।” হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। —এখনো কি এখানে আসো? আরিফ ঘুরে তাকাল। নীলা। হাতে একটা ছাতা। আরিফ অবাক হয়ে বলল, —তুমি এখানে? নীলা হাসল। —একটা কাজে এসেছিলাম। তোমাকে দেখে মনে হলো, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে। আরিফ মৃদু হেসে বলল, —কিছু জায়গা আছে, যেখানে এলে পুরোনো দিনগুলো মনে পড়ে। নীলা মাথা নাড়ল। তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখল। কিছুক্ষণ পর নীলা বলল, —আরিফ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? —করো। —তুমি কি কখনো ভেবেছ, যদি আমাদের গল্পটা অন্য রকম হতো? আরিফ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, —ভেবেছি। অনেকবার ভেবেছি। —তাহলে? আরিফ শান্ত গলায় উত্তর দিল, —হয়তো আমরা একসঙ্গে থাকতাম। হয়তো অনেক সুখের দিন কাটত। আবার হয়তো জীবনের অন্য কোনো কঠিন সময়ে আমাদের পরীক্ষা হতো। কে জানে? নীলা মৃদু হাসল। —তুমি এখন অনেক বদলে গেছ। —সময় মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। নীলা বলল, —তোমার ওপর আমার আর কোনো অভিমান নেই। আরিফ তার দিকে তাকিয়ে বলল, —আমারও নেই। বৃষ্টি তখন একটু বেড়ে গেছে। নীলা ছাতাটা খুলল। তারপর বলল, —আমি যাই, আরিফ। ভালো থেকো। আরিফ মাথা নাড়ল। —তুমিও ভালো থেকো, নীলা। নীলা ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। আরিফ দাঁড়িয়ে রইল। একসময় নীলা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। আরিফ আর তাকে ডাকল না। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, কিছু মানুষকে জীবনে ধরে রাখার চেয়ে তাদের ভালো থাকার কামনা করাও ভালোবাসারই একটা রূপ। ### শেষ অধ্যায়: ভালোবাসা কি সত্যিই শেষ হয়? বাড়ি ফেরার পথে আরিফের ফোনে একটা মেসেজ এল। নীলার কাছ থেকে। “আজ এত বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল। আমাদের গল্পটা হয়তো অসম্পূর্ণ, কিন্তু স্মৃতিগুলো সুন্দর। ভালো থেকো, আরিফ।” আরিফ মেসেজটা পড়ে মৃদু হাসল। তারপর লিখল, “তুমিও ভালো থেকো, নীলা। আমাদের গল্পটা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সুন্দর স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে।” মেসেজটা পাঠিয়ে সে ফোনটা পকেটে রেখে দিল। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টির পানিতে ঝাপসা হয়ে আছে। আরিফ হাঁটতে হাঁটতে ভাবল— জীবনে কিছু মানুষ আসে, যাদের সঙ্গে হয়তো সারাজীবন থাকা হয় না। তবু তারা আমাদের জীবনের একটা অংশ হয়ে থাকে। তাদের সঙ্গে কাটানো কিছু বিকেল, কিছু কথা, কিছু হাসি আর কিছু অভিমান আমাদের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে। আর ভালোবাসা? ভালোবাসা হয়তো সব সময় কাউকে নিজের করে পাওয়ার নাম নয়। কখনো ভালোবাসা মানে কারো স্মৃতিকে সম্মান করা। কখনো ভালোবাসা মানে নিজের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর কখনো ভালোবাসা মানে দূরে দাঁড়িয়েও কাউকে মন থেকে বলা— “তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।” সেদিন বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় আরিফ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল— সব গল্পের শেষ এক হয় না। কিছু গল্প শেষ হয় বিদায়ে। কিছু গল্প শেষ হয় নীরবতায়। আর কিছু গল্প? কিছু গল্প মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়, শেষ বিকেলের সেই ভালোবাসার মতো। ❤️

Post a Comment

Previous Post Next Post