দী’র্ঘ পাচবছর পর সৌদি থেকে আসলেন। সাংবাদিক ওনাকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার…See More

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সৌদি থেকে ফিরলেন তিনি…

বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক টার্মিনালে ভিড়। যাত্রীরা লাগেজ টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ আত্মীয়ের সঙ্গে কোলাকুলি করছে। কেউ ফুলেল অভ্যর্থনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় একজন নারী নজরে পড়লেন। পুরো শরীর ঢাকা কালো বোরকা, চোখের ওপর নিকাব। হাতে একটি ধূসর অ্যাডিডাস ব্যাগ। পাশে এক তরুণী গোলাপি পোশাকে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে। সাংবাদিকরা দৌড়ে গিয়ে ঘিরে ফেললেন তাঁকে।

মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, “আপা, দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সৌদি আরব থেকে ফিরলেন। কেমন লাগছে দেশে এসে?”

নিকাবের আড়াল থেকে একটু কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর এল, “ভালো লাগছে। অনেক দিন পর নিজের মাটি ছুঁয়েছি। বাতাসটাই অন্যরকম লাগছে।”

আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, “আপনার স্বামী কি সঙ্গে আসেননি? নাকি একাই ফিরলেন?”

প্রশ্নের পর নিকাবের নিচে চোখদুটো একটু নামিয়ে নিলেন তিনি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “স্বামী এখনো সৌদিতে। কাজের চাপের কারণে এবার আসতে পারেননি। আমি আগে চলে এলাম। পরিবারের কাছে থাকার প্রয়োজন ছিল।”

Connecting to our partner page

Please wait a moment

কিন্তু সাংবাদিকদের চোখ তখন অন্যদিকে। তাঁদের হাতে থাকা ছবিতে একজন পুরুষকে দেখানো হচ্ছিল—কালো চশমা পরা, নীল শার্ট পরা এক যুবক। ছবির দিকে ইঙ্গিত করে একজন বললেন, “এই ব্যক্তি কি আপনার পরিচিত? বিমানবন্দরে আপনার পাশেই দেখা গেছে তাঁকে। কয়েকজন যাত্রীও বলেছেন উনি আপনার সঙ্গে কথা বলছিলেন।”

নিকাবের আড়ালে চোখদুটো একটু বড় হয়ে গেল। তিনি দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বললেন, “না, চিনি না। অনেক লোক থাকে বিমানবন্দরে। হয়তো কাকতালীয়। আমি কাউকে চিনি না।”

তবু সাংবাদিকরা ছাড়লেন না। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলছিল, পাঁচ বছর আগে যখন তিনি সৌদি গিয়েছিলেন, তখন পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। সংসারে অশান্তি, শ্বশুরবাড়ির চাপ, আর স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব—এসব গুজব তখনই ছড়িয়েছিল। কেউ বলেছিলেন তিনি স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়ায় চলে গিয়েছিলেন। কেউ বলেছিলেন চাকরির জন্য গিয়েছিলেন। এখন ফিরে এসেও তাঁর আচরণে একধরনের সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।

বিমানবন্দরের বাইরে এসে তিনি দ্রুত একটি সিএনজিতে উঠে পড়লেন। পাশের তরুণীটিও সঙ্গে গেল। সাংবাদিকরা আরও কয়েকটা প্রশ্ন করতে গেলেও তিনি শুধু বললেন, “আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত কথা বলার কিছু নেই। আমি শুধু নিজের পরিবারের কাছে ফিরেছি। আমাকে বিরক্ত করবেন না।”

সিএনজিটা যখন রওনা দিল, তখন তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। পাঁচ বছর আগের কথা মনে পড়ছিল। তখন সবকিছু অন্যরকম ছিল। স্বামীর সঙ্গে কথা কম হতো, শ্বশুরবাড়িতে কেউ তাঁর কথা শুনত না। একসময় মনে হয়েছিল সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়াই ভালো। সৌদিতে গিয়ে প্রথমে খুব কষ্ট হয়েছিল। ভাষা বোঝে না, পরিবেশ অচেনা। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু মনের ভেতর সবসময় একটা শূন্যতা কাজ করত।

এখন দেশে ফিরেও সেই শূন্যতা একেবারে যায়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্নগুলো তাঁকে আরও চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে সেই কালো চশমা পরা যুবকের কথা। তিনি জানেন, ওই ব্যক্তি আসলে কে। কিন্তু বলার সাহস পাচ্ছেন না। কারণ বললে আরও বড় ঝড় উঠবে।

সন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছে মায়ের কোলে মাথা রেখে কেঁদে ফেললেন তিনি। মা শুধু বললেন, “ফিরে এসেছো তো, আর কিছু লাগে না।” কিন্তু তিনি জানেন, সত্যিটা বলা সহজ নয়। পাঁচ বছরের নীরবতা ভারী হয়ে আছে বুকের ভেতর।

সেদিনের ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়। কেউ বলেন, তিনি সত্যিই স্বামীর অনুমতি নিয়ে একা ফিরেছেন। কেউ বলেন, পেছনে অন্য কোনো গল্প লুকানো আছে। আর সেই কালো চশমা পরা যুবককে নিয়েও নানা জল্পনা চলতে থাকে। কেউ তাঁকে স্বামী বলে, কেউ বলে অন্য কেউ।

সত্যিটা অবশ্য শুধু তিনিই জানেন। নিকাবের আড়ালে লুকানো সেই চোখদুটো সেদিন অনেক কথা বলতে চেয়েও বলেনি। শুধু একটা কথা বারবার মনে মনে আওড়াচ্ছিলেন—

“পাঁচ বছর পর দেশে ফিরেছি। এবার শুধু শান্তি চাই… আর কাউকে কিছু জানতে দেব না।”

Post a Comment

Previous Post Next Post